বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির ২৪ বছর পূর্ণ হলো। বাংলাদেশে জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াড আয়োজন, আন্তর্জাতিক জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দল নির্বাচন ও প্রেরণ, শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসসহ উল্লেখযোগ্য সব কাজের নেপথ্যে রয়েছে এই সংগঠন। ২৫তম জন্মদিনে এর শুরুর কালের স্মৃতিচারণ করেছেন সংগঠনটির সভাপতি মুনির হাসান:

বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির (বাবিজস) আজ চব্বিশ বছর পূর্ণ হলো। পেছনে ফিরে তাকালে অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসে। মজার ব্যাপার হলো, আমরা আমাদের প্রিয় এই সংগঠনের জন্মদিন হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম ২৫ ডিসেম্বর তারিখটিকে। ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের যখন জন্ম হয়, তখন ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। সেই ক্যালেন্ডার অনুসারে তাঁর জন্মদিন ছিল ২৫ ডিসেম্বর। যদিও পরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এটি ০৪ জানুয়ারি হয়ে যায়, কিন্তু নিউটনকে স্মরণে রেখেই ২০০১ সালের সেই দিনে আমরা বাবিজস প্রতিষ্ঠা করি।

আমাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—দেশে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করা। কারণ সেই সময়ে আমরা দেখছিলাম, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ১৯৮৮ সালে এসএসসিতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল ৪৮ শতাংশ, যা ১৯৯৮ সালে এসে দাঁড়ায় মাত্র ২১ শতাংশে! এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের একটি সংগঠনের খুব দরকার ছিল। বিশেষ করে যখন আমরা ঠিক করলাম যে ঢাকার বাইরে বিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে কাজ করব। আমরা অখণ্ড ভারতের ‘সোসাইটি ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’-কে আদর্শ ধরে নাম রাখলাম—সোসাইটি ফর দ্য পপুলারাইজেশন অব সায়েন্স, বাংলাদেশ (Society for the popularization of Science, Bangladesh-SPSB)। নামটার বাংলা করা হয়, বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি (বাবিজস)। শুরুর দিকে আমাদের কার্যক্রমের মধ্যে ছিল সারা দেশে টেলিস্কোপ দিয়ে মঙ্গলগ্রহ দেখানো কিংবা ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়ানো।

২০০৩ সালে গণিত অলিম্পিয়াড পূর্ণোদ্যমে শুরু হলে আমাদের কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে আরাফাত সিদ্দিকী সোহাগের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে কিছু কর্মশালা ও স্মারক বক্তৃতা চালু ছিল। এরপর ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরে বুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করলে, আমরা ওর কাঁধে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিই। ওর হাত ধরেই শুরু হয় ‘আবদুল জব্বার জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মশালা’। এরপর ২০১১ সালে বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ)-এর নির্বাহি পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী-র উৎসাহে আমরা আবার বড় পরিসরে বিজ্ঞানের কাজে ফিরলাম। শুরু হলো ‘শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস’। আমাদের পরিকল্পনা ছিল সহজ, বাচ্চারা নিজেরা হাতে-কলমে গবেষণা করবে এবং সত্যিকার বিজ্ঞানীদের মতো কনফারেন্সে সেগুলো উপস্থাপন করবে। এভাবেই মাঠে গড়াল বিজ্ঞান কংগ্রেস ও জগদীশচন্দ্র বসু ক্যাম্প।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলছেন ড. ফারসীম মান্নান
বাংলাদেশ দল, আইজেএসও’২৫

২০১৩ সালে বায়োজিদ ভূঁইয়ার মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের (আইজেএসও) কথা জানতে পারি। ২০১৫ সালে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের তৌহিদুল আলম সাহেব আমাদের পাশে দাঁড়ালেন এবং শুরু হলো ‘বাংলাদেশ জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াড’। প্রথমবার অংশ নিয়েই আমাদের ফারহান রওনক ব্রোঞ্জপদক জেতে। সেই সাফল্যের ধারা আজও অব্যাহত আছে। এই বছর ২২তম আন্তর্জাতিক জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়েছে রাশিয়ার সোচিতে। সেখানে আমাদের কিশোররা দুর্দান্ত লড়াই করে ০৬টি ব্রোঞ্জ পদক এনেছে।

প্রথমবার আইজেএসও-র দল ফেরার পর বোঝা গেল, স্কুলের ব্যবহারিক ক্লাস আইজেএসওতে ভালো করার জন্য যথেষ্ট না। কাজেই আমরা তৈরি করলাম মাকসুদুল আলম বিজ্ঞানাগার (ম্যাসল্যাব)। নানা জনের সহযোগিতায় ল্যাবে কিছু যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ যোগাড় করে ফারসীম মান্নানের বাসার নিচতলায় এই ল্যাব শুরু হলো। পরে এটি স্থানান্তরিত হয়েছে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে। ২০২৩ সাল থেকে এটি আমাদের ইনস্টিটিউট ফ্লোরের এক কোণায় জায়গা নিয়েছে। আইজেএসওর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখানোর বিভিন্ন কর্মশালা ও অনলাইন ওয়ার্কশপ আয়োজিত হচ্ছে নিয়মিতই। শুরুর সেই সময় ল্যাবের জন্য ডেল কম্পিউটার্সের পক্ষ থেকে ১০টি ল্যাপটপ দেন আতিকুর রহমান। পরে আবারও দিয়েছেন। ম্যাসল্যাব এখন আর কেবল একটি ল্যাব নয়, এটি গবেষণার আঁতুড়ঘর। বাচ্চাদের গবেষণায় আরও উৎসাহিত করতে গত বছর থেকে আমরা শুরু করেছি ‘চিল্ড্রেন রিসার্চ ফান্ড’। এর মাধ্যমে ছোট ছোট গবেষণার জন্য আমরা অর্থায়ন করছি। এভাবেই আমাদের দুই দশক চার বছর হয়ে গেল।

ম্যাসল্যাবে কাজ করছে শিক্ষার্থীরা

জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও আমাদের বড় একটি কাজ শুরু হয়েছে। গত বছর ড. জেবা ইসলাম সেরাজ আপার সাথে আলাপ করতে করতে আমরা ‘এএস ইসলাম স্কুল অব লাইফ’ আয়োজনের পরিকল্পনা করি ২০২৪ সাল থেকে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ শামসুল ইসলাম স্যারের ১০০ বছর বয়স হওয়া উপলক্ষে এটি শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় আমরা এবং গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশি বায়োটেকনোলজিস্টস (GNOBB) মিলে গড়ে তুলেছি ‘বায়োইনফরমেটিক্স হাব’। আমাদের ল্যাবে এখন দুটি হাই-কনফিগারেশন পিসিসহ আধুনিক নানা সরঞ্জাম রয়েছে।

এ বছর আমাদের মুকুটে নতুন একটি পালক যুক্ত হয়েছে—আন্তর্জাতিক ম্যাথ ও সায়েন্স অলিম্পিয়াড (IMSO)। এটি মূলত প্রাইমারি স্কুলের ছোট বাচ্চাদের জন্য। এবারই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এই আয়োজনে অংশ নিয়েছে এবং আমাদের খুদে গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীরা ০২ টি সিলভার ও ১০ টি ব্রোঞ্জসহ মোট ১২টি পদক জয় করেছে! আমাদের ছোটদের এই প্রতিভা দেখে আমি সত্যিই অভিভূত।

আজ ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্মরণ করছি আমাদের সব কর্মী, শুভানুধ্যায়ী, নিন্দুক ও সমালোচকদের। সেই সঙ্গে আমাদের নানা কার্যক্রমের অংশগ্রহণকারী ও তাঁদের অভিভাবকদের। অনেক গোপনদাতা আমাদের এসপিএসবিকে সচল রেখেছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমাদের স্পন্সর আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনসহ সবাইকে ধন্যবাদ।

বিশেষ ধন্যবাদ এসপিএসবির স্বেচ্ছাসেবকদের, যাঁরা খেয়ে-না খেয়ে, নন-এসি বাসে করে সারা দেশে বিজ্ঞানের বার্তা বয়ে নিয়ে যায়। এদের অনেকে এখন বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখান থেকে খোঁজ রাখে, দেশে আসলে ঢুঁ দিয়ে যায়।

স্মরণ করছি আমাদের প্রয়াত অভিভাবক জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারকে। বিজ্ঞান কংগ্রেসে এসে প্রতিবার কিছু নতুন তথ্য বা চ্যালেঞ্জ দিয়ে যেতেন, যা ধরে আমরা এগোতে পারতাম। স্মরণ করি এ আর খান স্যার, প্রথম জিরো গ্র্যাভিটির বাঙালি এফ আর সরকার স্যার, আমাদের স্যারদের স্যার-এ এম হারুন অর রশিদ, যাঁদের ভালবাসায় আমরা ধন্য হয়েছি।

ধন্যবাদ দিতে চাই ড্যাফোডিল পরিবারের স্থপতি ড. সবুর খানকে। তাঁর সহযোগিতা না পেলে আমাদের নানা পরিকল্পনা কল্পনাই থেকে যেত। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরী স্যারের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা। তাঁর স্নেহ ও ভালবাসায় এসপিএসবি বেড়ে উঠছে ক্রমাগত।

সবাইকে বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা।

বিজ্ঞানের জয় হোক!