মহাকর্ষীয় তরঙ্গের খোঁজে একশো বছর

আজ থেকে একশো বছর আগে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কথা বলেছিলেন, বিজ্ঞানীরা সেটি পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে বাস্তবে শনাক্ত করার ঘোষণা দেন গত ১১ ফেব্রুয়ারি। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক), ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েব অভজারভেটরি (লাইগো) এবং ভার্গো (Virgo) সায়েন্টিফিক কোলাবোরেশনের গবেষকরা এই ঘোষণা দেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতের এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটির বিষয়ে সাধারণ মানুষকে জানানোর জন্য এবং তাদের মনে যেসব প্রশ্ন এসেছে, সেগুলির উত্তর খোঁজার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি (এসপিএসবি) এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি সায়েন্স সোসাইটি (ডিইউএসএস) যৌথভাবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করেছিল একটি পাবলিক লেকচার। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের খোঁজে একশো বছর শীর্ষক এই আয়োজনটিতে বক্তা হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. আরশাদ মোমেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান লাইব্রেরির পাশে অবস্থিত ফার্মাসী লেকচার থিয়েটারে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আসলে কী, এটা কীভাবে কাজ করে আর আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে এর স্থানই বা কোথায়? কীভাবে বিজ্ঞানীরা এই তরঙ্গ শনাক্ত করলেন? আর কেনই বা এটা শনাক্ত করতে একশো বছর লেগে গেল? সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নগুলি এসেছে এই আবিষ্কারের পর। গতকালের আয়োজনটিতে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। ড.আরশাদ মোমেন কথা বলেছেন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রকৃতি, ১৯১৫ সালে দেয়া আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের স্থান, এটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের করা গবেষণা, লাইগোর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার যন্ত্রের গঠন, কার্যপদ্ধতি এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের ইতিহাস নিয়ে।

পৃথিবী থেকে একশো ৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে দুটি কৃষ্ণগহ্বর পরস্পরকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায়ে মিশে যায়। এর ফলে সৃষ্টি হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ -যেটি পৃথিবী থেকে উপযুক্ত যন্ত্রের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। উৎস থেকে মহাকর্ষ তরঙ্গের বিস্তার তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে হ্রাস পায় এবং এ কারণে এটাকে শনাক্ত করা দুরূহ কাজ। এ কাজটা করার জন্য বিজ্ঞানীরা LIGO নামক যে যন্ত্র বানিয়েছেন, যার এক একটি বাহু ৪ কিলোমিটার লম্বা এবং ভরের পরিবর্তে তারা ভারী আয়না ব্যবহার করেছেন, যাদের নড়াচড়া লেজার রশ্মির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

লেজার রশ্মিগুলো এই আয়নাগুলোর মাঝে বারবার প্রতিফলনের কারণে ৭৫ বার আসা-যাওয়া করে যাতে আয়নার সামান্যতম নড়াচড়াও অনেকগুণ পরিবর্ধিত হয়। এর কারণে লাইগো অতীব সূক্ষ্ম একটি যন্ত্র, যা প্রোটনের ব্যাসার্ধের এক হাজার ভাগের এক ভাগ দূরত্বের নড়াচড়াও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কিন্তু এটা একটা সমস্যা,কারণ মাধ্যাকর্ষণ সব বস্তুর ওপর কাজ করতে পারে- যন্ত্রের পাশ দিয়ে চলমান ট্রাকও তার ভরের কারণে যন্ত্রের ওপর মাধ্যাকর্ষণ বল প্রয়োগ করতে পারে এবং আয়নার নড়াচড়ার কারণ হতে পারে। এ জন্য জানা প্রয়োজন মহাকর্ষ তরঙ্গের মহাজাগতিক উৎস কী কী হতে পারে এবং তাদের তৈরি করা তরঙ্গের বৈশিষ্ট্যগুলো কেমন। ১৯৬০-এর দশকে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্লাদিমির ব্রাগিনস্কি (Vladimir Braginsky) ও তার সহযোগীরা দেখালেন যে, দুটো কৃষ্ণগহ্বর (Blackhole) মিলিত হয়ে নতুন কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হওয়ার সময় যে মহাকর্ষ তরঙ্গ তৈরি হবে তা পৃথিবীতে শনাক্ত করা সম্ভব এবং তার বৈশিষ্ট্য চারপাশের সৃষ্ট সংকেতের চেয়ে বেশ ভিন্ন হবে। কিন্তু কেমন হবে সেই সংকেত? এই প্রশ্নটি ১৯৯০ থেকে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুললেও এর সম্যক উত্তর এলো ২০০১ সালে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় এর গবেষক ফ্রাঞ্জ প্রিটোরিয়াস (Franz Pretorius) কম্পিউটারে হিসাব করে বের করলেন ব্রাগিনস্কি ও তার দলের চিহ্নিত উৎস থেকে নিঃসৃত মহাকর্ষ তরঙ্গের চেহারা।

২০০২ সাল থেকে LIGO তার পর্যবেক্ষণ শুরু করলেও দীর্ঘ ১৩ বছর পরে তারা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। এর জন্য তাদের দু’দুবার যন্ত্রের উৎকর্ষতা বাড়ানোর জন্য আপগ্রেড করতে হয়েছে। যদিও তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মান সার্নের LHC এর খরচের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু এ আবিষ্কারের গুরুত্ব হিগস বোসন আবিষ্কারের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

লেকচারটির শেষে ড.আরশাদ মোমেন উপস্থিত দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড.নূরুজ্জামান খান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি সায়েন্স সোসাইটির মডারেটর লাফিফা জামাল এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির সহসভাপতি মুনির হাসান।

আয়োজনটি সমন্বয় করেছে এসপিএসবির নাফিস ওয়াহাব নিটোল। ছবি তুলেছে নোশিন ইসলাম হৃদি ও সফিকুল ইসলাম।

Comments

comments

This entry was posted in . Bookmark the permalink.