এসপিএসবি উইন্টার সায়েন্স স্কুল ২০১৫

স্কুলের শীতের ছুটিতে গত ২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে এসপিএসবি উইন্টার সায়েন্স স্কুল। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে এই বিজ্ঞান স্কুলটিতে। প্রথম দিনের সেশনগুলি অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। বিভিন্ন ধরণের সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ কথা বলেছেন। শিক্ষার্থীরা সেশনটিতে দশের পরিবর্তে অন্য কোন সংখ্যাকে ভিত্তি ধরে নতুন ধরণের সংখ্যাপদ্ধতি তৈরি করতে শিখেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটরের নির্মাতা সার্নের গবেষণা, সার্নে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং পার্টিকেল ফিজিক্সের মজার জগৎ নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. আরশাদ মোমেন। পোকামাকড়ের বিচিত্র জগৎ এবং তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে সেশন নিয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক গবেষক ও বিজ্ঞানী ড.রেজাউর রহমান। ছিল এবছরের জুলাই মাসে নিউ হরাইজনস মহাকাশযানের বামন গ্রহ প্লুটোর কাছ দিয়ে উড়ে যাবার ঘটনা নিয়ে ডকুমেন্টারি –চেজিং প্লুটো। সেশনগুলির ফাঁকে ছিল বন্ধুত্ব পর্ব। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যারা উইন্টার স্কুলে এসেছে,তারা নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং করেছে, বিজ্ঞান নিয়ে নিজেদের চিন্তাভাবনা অন্যদের সাথে শেয়ার করেছে। উইন্টার সায়েন্স স্কুলের দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারীদের পাঁচটি দলে ভাগ হয়ে একটি মজার ক্লু-হান্ট গেমে অংশ নিতে হয়। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকার আগারগাঁওয়ের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে। জাদুঘরের ৯টি গ্যালারিতে যেসব বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে, সেগুলির উপরে ভিত্তি করেই এই ক্লু-হান্টিং গেমটা তৈরি করা হয়েছিল। প্রথমে প্রতিটি দলকে ১৩টি করে পেনাল্টি কার্ড দিয়ে দেয়া হয়। গেমের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের একটা প্রাথমিক ক্লু দিয়ে দেয়া হয়। সেই ক্লু সমাধান করতে পারলে শিক্ষার্থীরা নতুন আরেকটা ক্লু পেয়েছে, সাথে পেয়েছে একটা স্টেপ কার্ড (প্রতি স্টেপ পার হতে পারলে একটা দল একটা স্টেপ কার্ড পেয়েছে।)। যদি কোন দল একটা স্টেপ পার হতে না পারে, তাহলে তারা একটি পেনাল্টি কার্ডের বিনিময়ে ক্লুটার উত্তর জেনে নিয়ে পরের স্টেপে যাওয়ার জন্য একটা স্টেপ কার্ড পেয়েছে, সাথে পরের স্টেপের জন্য একটা ক্লু। কোন একটা দলের জন্য তাদের কাছে থাকা পেনাল্টি কার্ড শেষ হয়ে গেলে অর্জন করা দুইটা স্টেপ কার্ডের বিনিময়ে একটা পেনাল্টি কার্ড নেয়ার ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি দলের জন্য একজন করে মেন্টর সাথে ছিল। ক্লুগুলি থেকে উত্তর খুঁজে বের করার জন্য প্রতিটি দলকেই পুরো জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ক্লু এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে মজার সব জিনিস, যেমন ফুকোর দোলক, তিমির কংকাল, বিজ্ঞানীদের ছবি, ৭২০ মেগাবাইটের হার্ডডিস্ক, অর্কিড হাউজ, সুরেলা টিউব, বৈদ্যুতিক আর্ক, ফরমালিনে রাখা শৈবাল, আপেলের বিম্ব ইত্যাদি। পুরো গেমের জন্য সময় ছিল ৩ ঘন্টা। কিন্তু প্রায় প্রতিটি দলই এক ঘন্টা কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি সময়ের মধ্যে সবগুলি ক্লু এর উত্তর বের করে ফেলতে পেরেছে। কোন একটা টিমের সর্বোচ্চ ২টা পেনাল্টি কার্ড ব্যবহার করতে হয়েছে। হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুলের হৃদিতা ইসলাম, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাজী সম্প্রীতি সামাদ, বরগুনার আমতলী এ কে মডেল পাইলট হাই স্কুলের গালিব মাহমুদ, ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলের জাওয়াদ উল সামি এবং তক্ষশীলা বিদ্যালয়ের ধ্রুব চৌধুরী - এই পাঁচজনের দলটি ক্লু হান্ট গেমে বিজয়ী হয়েছে। পুরষ্কার হিসেবে তারা পেয়েছে বই এবং সার্টিফিকেট। সকালে ক্লু-হান্টিং গেম শেষ হবার পর দুপুরে জাভেদ পারভেজ (ফাউন্ডিং সিইও, Dreams For Tomorrow, ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যানিং ও ফিন্যান্স, রবি আজিয়াটা লিমিটেড) জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা, স্বপ্ন পূরণ, বাধা অতিক্রম করা, সামাজিক রীতিনীতি এবং নিজের মূল্যবোধের মধ্যে যে বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দিতে হবে, নিজের শেকড় আঁকড়ে ধরে জীবনযাপন করা, পারিবারিক সমস্যাগুলিকে ধৈর্য্যের সাথে মোকাবেলা করা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একটি সেশনে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন তিনি। সেশনটি বিকেল পর্যন্ত চলে। তৃতীয় দিন, ২৩ ডিসেম্বর, সকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এম নূরুজ্জামান খান কথা বলেন কৃত্তিমভাবে তৈরি করা হাড় এবং তার ব্যবহার নিয়ে। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত বিভিন্ন স্মার্ট ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে তৈরি করা বেশ কিছু জিনিসের উদাহরণও তিনি দেন, যেসব জিনিস আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরো সহজ করে দিতে পারে। একটি উদাহরণ যেমন স্মার্ট ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি কৃত্তিম ঘাস, যেটি প্রাকৃতিক ঘাস থেকে অনেক দ্রুত পানি শোষণ করে ফেলে একটা জায়গাকে শুকনো বানিয়ে ফেলতে পারে খুব তাড়াতাড়ি। ড. নূরুজ্জামান একজন বিজ্ঞানী গবেষণাগারে যেভাবে সত্যিকার বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন, একটা জিনিস আবিষ্কারের বিভিন্ন পর্যায় ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেন। তিনি তাঁর নিজের গবেষণাগুলি নিয়েও শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করেন, এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। ক্লাসিকাল মেকানিক্স দিয়ে কেন প্রকৃতির সব রহস্যের ব্যাখ্যা হয় না, কেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চমকপ্রদ জগতটার সাথে পরিচিত হতে হয় ইলেক্ট্রন, ফোটন কিংবা অন্যসব ছোট ছোট কণার আচরণকে ব্যাখ্যা করার জন্য - এই বিষয়গুলি নিয়ে সবাই মন দিয়ে শুনছিল অন্যরকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগের কাছ থেকে। তৃতীয় দিন বিকেলে এই সেশনটি অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিমাত্রিক এবং ত্রিমাত্রিক জগৎ, সময়ের ধারণা, কণা হিসেবে ইলেক্ট্রনের আচরণ, ক্লাসিকাল মেকানিক্সের সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন পার্টিকেলের আচরণ ব্যাখ্যা করতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রয়োজনীয়তা, প্রোবাবিলিটি, ইয়াং এর ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট, কোয়ান্টাম এন্টেঙ্গেলমেন্ট ইত্যাদির মতো মজার সব বিষয় শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন মাহমুদুল হাসান সোহাগ। বিজ্ঞান কী, কীভাবে পড়তে হয় বিজ্ঞান? বিজ্ঞানীরা কীভাবে দেখেন চারপাশ? আমরাই বা কীভাবে দেখতে-বুঝতে চেষ্টা করবো? শুধু বই পড়লেই কি হবে, নাকি চোখ মেলে চারপাশটাকে জানতে-বুঝতে-দেখতে হবে? আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো কীভাবে সাহায্য করবে আমাদের? ইন্দ্রিয়গুলোর ক্ষমতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়? ইন্দ্রিয়গুলোকে সাহায্য করার জন্য আমরা যে যন্ত্র ব্যবহার করি সেগুলো অনুভব করার উপায় কী? সর্বোপরি বিজ্ঞানে মাপজোখ কেন দরকার? কীভাবে মাপবো আমাদের পৃথিবী? এরকম মজার সব বিষয় নিয়ে তৃতীয় দিনের শেষ সেশনটি ছিল। এসপিএসবির সহকারী অ্যাকাডেমিক কোঅর্ডিনেটর ইবরাহিম মুদ্দাসসের সেশনটি পরিচালনা করেন। সেশনটির একেবারে শেষে নিজেকে নিয়ে একটা প্যারাগ্রাফ লিখতে দেয়া হয়েছিল অংশগ্রহণকারীদের। পুরো সেশনটাই ছিল ইন্টার‍্যাকটিভ, নানা প্রশ্ন এবং প্রতিপ্রশ্নের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে সেশনটিতে। তৃতীয় দিন বিকেলেই উইন্টার স্কুলে আসেন এসপিএসবির সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্কুলের বিভিন্ন সেশনে তারা যা যা শিখছে, তা নিয়ে কথা বলেন এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা শোনেন। তিনি সঠিকভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা, বিজ্ঞান প্রজেক্ট তৈরি, বিজ্ঞানে মাপজোখের গুরুত্ব, বিজ্ঞান মেলার জন্য প্রস্তুতি নেয়া বিষয়ে কথা বলেন এবং হাতেকলমে পরীক্ষা করে বিজ্ঞানের আনন্দকে উপভোগ করতে শিক্ষার্থীদের আহবান জানান। পরে তিনি ক্লু-হান্টিং গেমে যে দলটি বিজয়ী হয়েছে, তাদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেন। শেষ দিন, ২৩ ডিসেম্বর ছিল জনপ্রিয় লেখক এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির সভাপতি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের জন্মদিন। সন্ধ্যায়, স্কুলের সেশনগুলি শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা একটি বড় ক্যানভাসে শুভেচ্ছা বার্তা লিখে জাফর ইকবাল স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়। এসপিএসবি উইন্টার সায়েন্স স্কুলটি ছিল তিনদিনের। তৃতীয়দিন শেষবেলায় বিদায়ের সময় মেন্টর এবং শিক্ষার্থী -সবার মনই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তারপরও, তিনদিন বিজ্ঞানের জগতে খুব আনন্দের সময় কেটেছে বলে সবাই জানায়। সবারই অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে, মেন্টরদের সাথে পরিচয় হয়েছে। তিনদিনের চমৎকার অভিজ্ঞতা আর অসংখ্য স্মৃতি সাথে নিয়েই সবাই বাড়ি ফিরে গেছে। উইন্টার সায়েন্স স্কুলের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেছে তানভীরুল ইসলাম। এছাড়া মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে এসপিএসবির অ্যাকাডেমিক টিমের শেখ মোহাম্মদ আরমান শাফিন, খালিদ বিন ইসলাম, সজীব বর্মন, নাজিয়া কাইয়ুম নিঝুম, নাফিস ওয়াহাব নিটোল, তাফসীর অনি, মিশাল ইসলাম, কামরুল হাসান, নওরিন ইসলাম, হাসান নাহিয়ান নোবেল, শাদমান শাহরিয়ার শাওন, জুলিয়ান জাওয়াদ আহমেদ, সায়েফ রহমান আবির, জুনায়িদুল ইসলাম, ইবরাহিম মুদ্দাসসের এবং শিবলী বিন সারওয়ার। উইন্টার স্কুলের সব ছবি তুলেছে সালসাবিল।
This entry was posted in . Bookmark the permalink.