আমার মুক্তি আলোয় আলোয়: আন্তর্জাতিক আলোর বছর ২০১৫ এর সমাপনী

জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আলো এবং আলোক-প্রযুক্তির বছর ২০১৫ শেষ হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে আলোর বছরের কার্যক্রমের সমাপনী অনুষ্ঠান। আমার মুক্তি আলোয় আলোয় শিরোনামে এই অনুষ্ঠানটিতে ছিল আন্তর্জাতিক আলোর বছর উপলক্ষে বাংলাদেশে যেসব আয়োজন করা হয়েছিল, সেগুলি নিয়ে আলোচনা, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী এবং আলো নিয়ে না-গান গাওয়ার দল এর পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই আয়োজনটি চলে। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল আন্তর্জাতিক আলোর বছর উদযাপনে বাংলাদেশে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সহযোগী বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি (এসপিএসবি)।

বাংলাদেশ আলোর বছর উদযাপন উপলক্ষে এসপিএসবির আয়োজন ছিল সারা বছর জুড়েই। মূলত দুটো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এসপিএসবি বাংলাদেশে আলোর বছরের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে: আলোর কথামালা (Light Talks) এবং আলোর ঝিলিক (Spark of Light)।

আলোর কথামালা ছিল সব শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য আয়োজিত পাবলিক লেকচার। আলো নিয়ে যেসব বিজ্ঞানী কাজ করেছেন, তাঁদের জীবন এবং গবেষণা, আলোক প্রযুক্তির বিবর্তন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং বিজ্ঞানীরা এই আয়োজনটিতে বক্তৃতা করেছেন। আলোর কথামালার মোট ৪ টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি পর্বেই উপস্থিত ছিল গড়ে একশোর বেশি দর্শক। অন্যদিকে আলোর ঝিলিক ছিল হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে আলোর ধর্মগুলি জানানো এবং বুঝানোর আয়োজন। এসপিএসবির অ্যাকাডেমিক দলের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জেলায় হাই স্কুলগুলোতে গিয়েছে, শিক্ষার্থীদের আলোর ধর্মগুলি টুলবক্সে থাকা সাধারণ কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে হাতেকলমে দেখিয়েছে। ২০১৫ সালে সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোর ঝিলিকের মোট ৩৮টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আলোর বছরের সমাপনী অনুষ্ঠানে কথা হয়েছে এই আয়োজনগুলো নিয়েই। আলোর ঝিলিকে যেসব শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল এবং এসপিএসবির অ্যাকাডেমিক দলের যারা আলোর ঝিলিক পরিচালনা করেছিল, তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে। দেখানো হয়েছে আলোর বছরে এসপিএসবি কার্যক্রম নিয়ে নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি। এসপিএসবির আলোর বছরের কার্যক্রমের সমন্বয়ক শিবলী বিন সারওয়ার আলোর ঝিলিক এবং আলোর কথামালায় যেসব স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেছেন, এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন থেকে শুরু করে সেশন পরিচালনা করেছেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। উপস্থিত দর্শকেরা হাততালির মাধ্যমে তাদেরকে ধন্যবাদ জানায়।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক বিজ্ঞানী ও গবেষক ড. রেজাউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন এবং রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নুরুজ্জামান খান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. আরশাদ চৌধুরী, একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির সহসভাপতি মুনির হাসান। শুভেচ্ছা বক্তব্যে ড. লাফিফা জামাল এবং ড. নুরুজ্জামান খান আলোর বছরে এসপিএসবি যেসব আয়োজন করেছে, সেগুলোর জন্য ধন্যবাদ জানান। আলোর ঝিলিকের মতো হাতেকলমে বিজ্ঞান চর্চার আয়োজনগুলো স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞানের ভয় দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন। পরে আলোর ঝিলিকের পৃষ্ঠপোষক অ্যাপবিডি এবং বিজমোশন লিমিটেডকে এসপিএসবির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেয়া হয়।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল না-গান গাওয়ার দল এর পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সলীল চৌধুরীর গান নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। “এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে”, “এই তো ভালো লেগেছিল আলোর নাচন পাতায় পাতায়”, “চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে”, “অন্ধকারের উৎস-হতে উৎসারিত আলো সেই তো তোমার আলো”, “ও আমার চাঁদের আলো” সহ বেশ কিছু গান পরিবেশন করা হয়। এছাড়া ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের মধ্যে ১৯৩০ সালে হওয়া একটি বিশেষ কথোপকথন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।

গত বছর – ২০১৫ সালকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আলো এবং আলোক-প্রযুক্তি বছর হিসেবে পালন করেছে। আন্তর্জাতিক আলোর বছর পালনের উদ্দেশ্য ছিল কীভাবে আলো এবং আলোক-প্রযুক্তিগুলি মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে,জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করেছে, জীবনকে সহজ করেছে, সেটা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা, এবং কীভাবে ভবিষ্যতে আরো ব্যাপক মাত্রায় অবদান রাখতে পারে সে বিষয়েও মানুষকে জানানো। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮তম সেশনে ২০১৫ সালকে আন্তর্জাতিক আলো এবং আলোক-প্রযুক্তির বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সারা পৃথিবীর ৮৫টির বেশি দেশ থেকে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক আলোর বছর উদযাপনে জাতিসংঘের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশে আলোর বছর উদযাপনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি। আলোর বছর নিয়ে আরো জানতে পারা যাবে www.light2015.org এই ওয়েবসাইটে।

আলোর বছরের সমাপনী অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছে তানভীরুল ইসলাম ও নায়লা রওনক। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং সহযোগিতায় ছিল মিশাল ইসলাম, তাফসীর অনি, ইবরাহিম মুদ্দাসসের ও শিবলী বিন সারওয়ার। গান পরিবেশন করেছে না-গান গাওয়ার দল। ছবি তুলেছে শফিক পারভেজ।

Comments

comments

This entry was posted in . Bookmark the permalink.