একটি নরমাল লাইটিং সার্কিটে কি পরিমাণ হিসাব নিকাশ থাকতে পারে তা কি তোমরা জান?

একটি সিম্পল এলইডি লাইটিং সার্কিট ধরে নেয়া যাক। যার কম্পোনেন্ট গুলো হলঃ

১। এলইডি (সাদা)

২। রেজিস্টর (২২০Ω, ১০০Ω)

৩। ব্যাটারি (৯ ভোল্ট)

৪। সংযোগ তার

অতিরিক্তঃ

১। মাল্টমিটার

২। ব্রেডবোর্ড

 

প্রথমে রেজিস্টরেরর কাজ জেনে নেই। সংক্ষেপে রেজিস্টরের কাজ হল বিদ্যুৎ প্রবাহে বাঁধার সৃষ্টি করা। এর আরও কাজ (প্রয়োগ) আমরা সামনে দেখব। ব্যাটারি ৯ ভোল্ট দেয়া হয়েছে উদাহরণের সুবিধার জন্য ও সহজলভ্য।

প্রথমে একটি সিরিজ সার্কিট সংযোগ দেই যার মধ্যে ব্যাটারি, এলইডি, রেজিস্টর এবং তাদের সংযোগ দেয়ার জন্য তার রয়েছে। যদি ব্যাটারি ৯ ভোল্টের সাথে এলইডি সরাসরি সংযোগ দেয়া হত তাহলে সেটি অল্প একটু জ্বলে নষ্ট হয়ে যেত। কারণ এলইডি জ্বলতে ১.৮-৩.৩ ভোল্টের (লাইটের রঙের উপর নির্ভর করে) প্রয়োজন হয়। তাই এলইডি এর দুই প্রান্তে ভোল্টেজ ডিফারেন্স (বিভব পার্থক্য) সর্বোচ্চ ৩.৩ ভোল্ট (সাদা এলইডি-এর ক্ষেত্রে) রাখতে হবে।

তাহলে বাকী ৯-৩.৩=৫.৭ ভোল্ট যাবে কই? বাকী ৫.৭ ভোল্ট রেজিস্টর মধ্য দিয়ে বাইপাস (ভোল্টেজ ড্রপ) করতে হবে। একে ভোল্টেজ ডিভাইডার সূত্র (কার্শফের ভোল্টেজ সূত্র) বলে।

এখন কথা হল কত মানের এবং কি ধরনের রেজিস্টর সংযোগ দিতে হবে? এই মাপজোকটা খুব সহজে করা যাবে ও’হমের সূত্রের (V=IR) সাহায্যে। এলইডি গুলো জ্বালাতে সাধারণত ১০-২০ মিলি অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট প্রয়োজন। কারেন্ট যত বেশি হবে এলইডি এর উজ্জ্বলতাও তত বৃদ্ধি পাবে।

আমাদের ভোল্টেজ এবং কারেন্ট দুটোই জানা আছে, এখন আমরা খুব সহজে রেজিস্টরের মান বের করতে পারব। ব্যাটারির ভোল্টেজ থেকে এলইডি এর ভোল্টেজ বিয়োগ করে বিয়োগফলকে কারেন্ট দ্বারা ভাগ করলে রেজিস্টরের মান পাওয়া যাবে।

R=V÷I= (৯-৩.৩)ভোল্ট ÷ ২০মিলি অ্যাম্পিয়ার =২৮৫Ω. আমার কাছে ২৮৫ ওহমের রেজিস্টর নেই, তাই ১টা ২২০Ω ও ১টা ১০০Ω মানের রেজিস্টর সিরিজে লাগিয়ে ২২০+১০০=৩২০Ω বানিয়ে নিয়েছি। তাহলে কারেন্টের মান দাঁড়াচ্ছে ১৭.৮১ মিলি অ্যাম্পিয়ার। সূত্র থেকে তোমরা নিজেরা হিসেব করে মিলিয়ে নাও।

রেজিস্টরের মান তো পাওয়া গেল। এখন আবার রেজিস্টর নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবার একটু মাপজোক করে নিতে হবে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সাধারণত সকল সার্কিট পাওয়ারে হিসাব নিকাশ করা হয়, যার একক হল ওয়াট। বাজারে প্রচলিত রেজিস্টর গুলো ঠিক তেমনি ওয়াট হিসেবে বিক্রি করা হয়। রেজিস্টর গুলো সাধারণত ১/৪ (২৫০ মিলি ওয়াট) ওয়াট, ১/২ (৫০০ মিলি ওয়াট) ওয়াট, ১ ওয়াট, ২ ওয়াট এ ধরনের পাওয়া যায়। আমাদের সার্কিটে ঠিক কত ওয়াটের রেজিস্টর লাগবে সেটা একটু হিসেব করে দেখি।

ওয়াটের হিসেবের জন্য P=VI=I²R=V²/R এই সূত্রটি লাগবে। আমরা যেহেতু রেজিস্টরের মান এবং সিরিজ সার্কিটে কারেন্টর মান জানি সেহেতু P=I²R সূত্র দিয়ে পাওয়ার বের করতে পারব।

P=(১৭.৮১)x৩২০=১০১.৫ মিলি ওয়াট।

P=VI, P= V²/R সূত্র দিয়েও মান বের করা যাবে। তোমরা নিজেরা চেষ্টা করে দেখতে পার, উত্তর একই আসবে।

তাহলে আমাদের ১/৪ ওয়াটের রেজিস্টর লাগবে। যদি ফলাফল ২৫০-৫০০ মিলি ওয়াটের মধ্যে হত, তাহলে ১/২ ওয়াটের রেজিস্টর লাগত। যদি হিসাবকৃত ওয়াটের চেয়ে কম ওয়াটের রেজিস্টর ব্যবহার করা হয় তবে এলইডি/রেজিস্টরটি খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যাবে এবং পুড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ফলে সার্কিটটি কাজ করবে না।

 

এ তো গেল একটি এলইডি এর ক্ষেত্রে হিসাব নিকাশ। যদি দুই বা ততোধিক এলইডি সিরিজে থাকে তাহলে হিসাব কি রকম হবে? প্রতিটি এলইডি এর জন্য ৩.৩ ভোল্ট (সাদা এলইডি-এর ক্ষেত্রে) করে বাদ দিতে হবে, ব্যাটারি ৯ ভোল্ট থেকে। ৯-৩.৩-৩.৩=২.৪ ভোল্ট। এক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ ২টি এলইডি সিরিজে সংযোগ দিতে পারব, এর বেশি সংযোগ দিলে কোন এলইডি জ্বলবে না। কারণ প্রতিটি এলইডি পর্যাপ্ত পরিমাণ ভোল্টেজ পাবে না।

 

এবার আসি প্যারালাল (সমান্তরাল) সার্কিটের ক্ষেত্রে। প্যারালাল সার্কিটে ভোল্টেজ একই থাকে কিন্তু কারেন্ট প্রতিটি এলইডি/কম্পোনেন্টটের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। তাই প্যারালাল এলইডি গুলোর আগে একটি রেজিস্টর সিরিজে লাগিয়ে প্যারালাল এলইডি গুলোর দুই প্রান্তে বিভব পার্থক্য/ভোল্টেজ ৩.৩ ভোল্ট এ নিয়ে আসতে হবে। বাকি ৫.৭ ভোল্ট যাবে রেজিস্টরের মধ্যে। এ সার্কিটের মধ্যে যে কারেন্টে পাওয়া যাবে তা এলইডি গুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। একে কারেন্ট ডিভাইডার সূত্র (কার্শফের কারেন্টের সূত্র) বলে। আগেই বলেছিলাম কারেন্টের উপর এলইডি এর উজ্জ্বলতা নির্ভর করে, তাই এলইডি-এর পরিমাণ যত বেশি হবে উজ্জ্বলতা তত কমবে। এজন্য কারেন্টের মান বাড়াতে হবে। এখানে একটা মজার ব্যাপার হল, সিরিজ সার্কিটে যেখানে ২টার বেশি এলইডি জ্বালানো সম্ভব হচ্ছিল না সেখানে প্যারালাল সার্কিট দিয়ে ১০টিরও বেশি এলইডি জ্বালানো যাবে। এক্ষেত্রে আগের সূত্রটি ব্যবহার করে শুধু রেজিস্টরের মান পরিবর্তন করে কারেন্টের মান বাড়াতে হবে। আমাদের বাসা-বাড়িতে লাইনের কানেকশনগুলো এজন্য সমান্তরালে দেয়া হয়। আমি তোমাদের ১টি সার্কিট এঁকে দিচ্ছি (সবুজ এলইডি-এর ক্ষেত্রে, যার থ্রেশল্ড ভোল্টেজ ২.৩১ ভোল্ট)।

তোমরা নিজেরা চেষ্টা কর। না পারলে এই পোষ্টের নিচে কমেন্ট কর।

তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, এলইডি সাধারণত প্যারালালি সংযোগের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়। যদি প্যারালালি সংযোগ দিতে হয়, তবে প্রতিটি এলইডি-এর সাথে সিরিজে একটি করে রেজিস্টর লাগাতে হবে। তোমরা এখানে ৩৫Ω- এর রেজিস্টরটি আলাদা সংযোগ না করে প্রতিটি ১০Ω-এর সাথে সিরিজে/যোগ করে দিতে পার, আমি দিয়েছি আগের সার্কিটের সাথে সামজস্য রাখার জন্য।

 

এলইডি সম্পর্কে কিছু কথাঃ

তোমাদের মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে, সব সময় ব্রাকেটে ‘সাদা এলইডি’ আর ৩.৩ ভোল্ট ব্রাকেটে ‘লাইটের রঙের উপর নির্ভর করে’ লিখাটা ব্যবহার করা হয়েছে কেন? নিচের ছবিটি দেখলে তোমাদের কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। একেক ধরনের এলইডি জ্বালানোর ক্ষেত্রে একেক ধরনের ভোল্টেজ (থ্রেশল্ড ভোল্টেজ) লাগে। সবচেয়ে কম ভোল্টেজ লাগে লাল এলইডি জ্বালাতে ১.৮ ভোল্ট এবং সবচেয়ে বেশি ভোল্টেজ লাগে। এর কারণ হল ব্যান্ডগ্যাপ। ব্যান্ডগ্যাপ সম্পর্কে জানতে নিচের ৬নং লিংক দেখতে পার। সাদা এলইডি জ্বালাতে লাগে ৩.৩ ভোল্ট। একে থ্রেশল্ড (Threshold) বা কার্যকরী ভোল্টেজ বলে। এর মানে হল এই ভোল্টেজ পেলেই এলইডি জ্বলতে শুরু করবে। আবার ভোল্টেজের এই মানের কিছুটা তারতম্য হতে পারে, কি ধরনের উপাদান (InGaN/AlGaInP/AlGaAs/GaP) দিয়ে এলইডি বানানো হয়েছে তার উপর। এলইডি-এর ২টি পিন থাকে। লম্বা পিনটি ব্যাটারির পজিটিভের এবং ছোট পিনটি নেগেটিভের সাথে লাগাতে হয়। এলইডি এবং সার্কিট সম্পর্কে আরও জানতে নিচের লিংক গুলো দেখতে পার।


চিত্রঃ বিভিন্ন রঙের এলইডি-এর ক্ষেত্রে কার্যকরী ভোল্টেজ


চিত্রঃ এলইডি-এর ফ্লো-চার্ট ডায়াগ্রাম

 

প্রথমে যে সার্কিটটি দেওয়া হয়েছিল সেটি ‘মাল্টিসিম-১২’ সফ্টওয়্যার দিয়ে সিমুলেশন করা। অনলাইনে এরকম আরও অনেক সফ্টওয়্যার পাওয়া যায়, যা দিয়ে সার্কিট কানেকশন দেয়ার আগে কোন সার্কিট ঠিক আছে কিনা এবং সকল কম্পোনেন্টের মান ঠিক আছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। প্রদত্ত সার্কিটের ফলাফলঃ

সকল কম্পোনেন্ট সার্কিটে বসানোর পর তা থেকে যে একদম সঠিক ফলাফল পাবে তার কোন নিশ্চয়তা  নেই। তবে মান কিছুটা এদিক ওদিক হতে পারে কিন্তু একেবারেই কম বা বেসি হবে না। মান এদিক ওদিক হবার ব্যাপারটাকে অন্যভাবে টলারেন্স লেভেল বলে। যারা কম্পোনেন্ট বানায় তারা এই টলারেন্স লেভেল দিয়ে থাকে। আবার বিভিন্ন ধরনের উপাদানের (Material) জন্য মান ভিন্ন আসতে পারে। যেমন প্রথম সার্কিটটা যখন সংযোগ দেই আমার মাল্টিমিটারে কিছুটা কম ভোল্টেজ প্রদর্শন করে। এর কারণ হচ্ছে প্রদত্ত গ্রাফটা যে কম্পোনেন্টের জন্য বানানো হয়েছে, আমার এলইডিটা সেই কম্পোনেন্টের না, হয়ত অন্য কোন কম্পোনেন্টের জন্য। তবে আমাদের একটা বেজ/আদর্শ মান নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে, কম্পোনেন্টের উপাদানের (Material) জন্য ফলাফলের কিছুটা হেরফের হতে পারে।

 

১। https://en.wikipedia.org/wiki/LED_circuit  (এটা কোন রেফারেন্স না, এই লিংকের ভিতর রেফেরেন্স আছে। তোমাদের বোঝার সুবিধার জন্য এই লিংকটা দিলাম)

২। http://www.electronics-tutorials.ws/diode/diode_8.html (Last Access 5th march, 2016)

৩। https://learn.sparkfun.com/tutorials/light-emitting-diodes-leds (Last Access 5th march, 2016)

৪। https://www.sparkfun.com/products/9590 (Last Access 5th march, 2016)

৫। http://www.gizmology.net/LEDs.htm (Last Access 7th march, 2016)

৬। http://chemwiki.ucdavis.edu/Core/Materials_Science/Semiconductors/Light_Emitting_Diodes (Last Access 25th march, 2016)

৭। http://www.ledsmagazine.com/articles/2004/01/what-is-an-led.html (Last Access 25th march, 2016)

 

Comments

comments