রাধাগোবিন্দ চন্দ্র (১৮৭৮-১৯৭৫) উপমহাদেশের পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার পথিকৃৎ

আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে বিশ্ব বিখ্যাত হার্ভার্ড মানমন্দিরের ডিরেক্টর বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হ্যারলো শ্যাপলি যশোহর জেলায় একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে লেখা ছিল –

বিদেশ থেকে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র সম্পর্কে আমরা যেসব পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য পেয়ে থাকি তার মধ্যে আপনার দান অন্যতম। আপনাকে আমরা আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

চিঠিটির প্রাপক যশোর জেলার কালেক্টরেট অফিসের একজন সামান্য কেরানী। যিনি, এমন কি তৎকালীন এন্ট্রাস পরীক্ষায়ও পাশ করতে পারেননি। কেরানীর নাম রাধাগোবিন্দ চন্দ্র। ভারত উপমহাদেশের সফলতম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একজন।

যশোর জেলার বগচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই জ্যোতির্বিজ্ঞানীর লেখাপড়ার প্রতি তার তেমন আগ্রহ ছিলনা। বরং রাতের আকাশের প্রতি আকর্ষন ছিল বেশি। এজন্য তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল অতি সাধারণ মানের এবং সংক্ষিপ্ত। এমনকি তিন তিন বার প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেও তিনি কৃতকার্য হতে পারেননি। ১৯০০ সালের দিকে ২২ বৎসর বয়সে যশোহর কালেক্টরেট অফিসের ১৫ টাকা বেতনের সামান্য কেরানির চাকরি গ্রহণ করেন। এ থেকে পরে তিনি ট্রেজারি ক্লার্ক ও কোষাধ্যক্ষের পদে প্রমোশন পান। অবসর নেবার সময় তার মাসিক বেতন ছিল ১৭৫ টাকা।

“অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।” 

আকাশ পাগল রাধা তৎকালীন ষষ্ঠ শ্রেণীর “ব্রহ্মাণ্ড কি প্রকাণ্ড” প্রবন্ধ পড়েই জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই তিনি আকাশ পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন। তবে এ ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়ার মতো কোন শিক্ষক তাঁর ছিল না। পরে তিনি যশোরের আইনজীবী কালীনাথ মুখার্জীর কাছ থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ নেন।

১৯১০ সালে রাধাগোবিন্দ চন্দ্র খালি চোখে হ্যালির ধুমকেতু পর্যবেক্ষণ করেছিলেন অনেকদিন ধরে। অভ্যাসমত একটি খাতায় তিনি তার পর্যবেক্ষণ লিখে রাখতেন। হ্যালির ধূমকেতু দেখার পরই রাধা ‘ধুমকেতু’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
তার প্রবন্ধ পড়ে শান্ডি নিকেতনের বিজ্ঞান শিক্ষক জগদানন্দ রায় মুগ্ধ হয়ে চিঠি দিলেন রাধাগোবিন্দকে, পরামর্শ দিলেন একটি দূরবীণ সংগ্রহের। উৎসাহ ও বিভিন্ন সহযোগিতা পেয়ে ১৯১২ সালে জমি বিক্রি করে আর বেতনের টাকা জমিয়ে তিন ইঞ্চি ব্যাসের একটি ছোট্ট দূরবীণ কিনেছিলেন। দাম পড়েছিল ১৬০টাকা ১০ আনা ৬ পাই।

রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের অধিকাংশ অবদান ছিল বিষম তারার ওপর। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মানমন্দির, ব্রিটিশ অ্যাষ্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন এবং ফ্রান্সের লিওঁ মানমন্দিরে নিয়মিত পাঠাতেন। ১৯২৮ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে সম্মানসূচক ‘Officer d’Academic’ উপাধি ও পদক প্রদান করেন। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি AAVSO কে সর্বমোট ৩৭,২১৫ টি বিষম তারা সম্পর্কে উপাত্ত সরবরাহ করেন।

শেষ জীবনে তার ৬ ইঞ্চি ব্যাসের ঐ দূরবীণটি ভারতের হায়দ্রাবাদের কে, ভেইনু বাপ্পুকে দিয়ে দেন। এই মহান জ্যোতির্বিদ ৯৭ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল পরলোক গমন করেন।

তথ্য সূত্র : মনোরঞ্জন বিশ্বাসের যশোর ইতিবৃত্ত , বেনজিন খানের প্রকাশিত গদ্য।

উইকিপিডিয়া: https://goo.gl/oEd7Fb

 

উপমহাদেশের এই জ্যোতির্বিদকে স্মরণ করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির আয়োজনে এবং বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি ও ইউনিভার্স অ্যাওয়ারনেসের সহযোগিতায় আগামী ২৫ এপ্রিল, ২০১৬ তে ৩য় বারের মতো আয়োজন করতে যাচ্ছে ৩য় রাধাগোবিন্দ চন্দ্র স্মারক বক্তৃতা

“মহাবিশ্বের প্রদীপ: সুপারনোভা” শিরোনামের এই আয়োজনটিতে কথা বলবেন চীনের পার্পল মাউন্টেন অবজারভেটরিতে প্রেসিডেন্টস ইন্টারন্যাশনাল ফেলো হিসেবে কর্মরত ড. সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন। লেকচারটি মাইক্রোবায়োলজি অডিটোরিয়াম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। আরও বিস্তারিত জানা যাবে  ফেসবুক ইভেন্ট পেজ থেকে।

 

 

Comments

comments